সংবাদ সম্মেলনে নীরা রব্বানী ও ওসমান চৌধুরীর অভিযোগ বাংলাদেশ সোসাইটিতে নানা অনিয়ম, গঠনতন্ত্র মানা হচ্ছে না, কর্মকর্তাদের যোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ

September 25, 2019, 11:38 AM, Hits: 2265

সংবাদ সম্মেলনে নীরা রব্বানী ও ওসমান চৌধুরীর অভিযোগ বাংলাদেশ সোসাইটিতে নানা অনিয়ম, গঠনতন্ত্র মানা হচ্ছে না, কর্মকর্তাদের যোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ

সালাহউদ্দিন আহমেদ, হ-বাংলা নিউজ, নিউইয়র্ক থেকে : যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের আব্রেলা সংগঠন হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ সোসাইটির নানা অনিয়ম সহ সোসাইটির গঠনতন্ত্র মোতাবেক পরিচালিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি সোসাটিতে চলছে নানা আর্থিক অনিয়ম। সঠিকভাবে নেতৃত্বে দিতে কর্মকর্তাদের যোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর সোমবার সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসের একটি রেষ্টুরেন্টে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে  এমন অভিযোগ করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে সোসাইটির নানা অনিয়ম তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য রাখেন সোসাইটির আজীবন সদস্য নীরু এস নীরা রব্বানী। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জেকব মিলটন। এসময় সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তা ওসমান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় সোসাইটির অনিয়ম দূর করতে আইনের আশ্রয় নেয়া হয়েছে।  এই লক্ষ্য অর্জনে কুইন্স কাউন্টির সুপ্রীম কোর্ট অব নিউইয়র্কে দু’টি মামলা দয়ের করা হয়েছে (ইনডেক্স নং ৭১৬০৫২/২০১৯ তারিখ: ০৯/১৮/২০১৯, অন্যটির ইনডেস্ক নং ৭১৬০৫৪/২০১৯)। মামলায় সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন সিদ্দিকী সহ কার্যকরী পরিষদের সকল কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে। মামলার বাদী নীরু এস নীরা এবং ওসমান এ চৌধুরী।

সংবাদ সম্মেলনে নীরু এস নীরা তার লিখিত বক্তব্যে বলেন: ১৯৭৬ সালে কিছু মানুষের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ সোসাইটি নামের একটি সংগঠন। সংগঠিনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রবাসে বাংলাদেশী  কালচারের প্রসার ঘটিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে রাখা, তাদের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এবং দেশের অস্তিত্ব ও উন্নয়নের প্রশ্নে ভূমিকা রাখা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি এই যে প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকেই কিছু অযোগ্য, অথর্ব, স্বার্থান্বেষী, লোভী এবং স্বেচ্ছাচারিতায় ভরপুর কিছু পরিচয়হীন অসৎ মানুষ সংগঠনটিকে নিজেদের ব্যক্তিগত আকাঙ্খা পরিপূরণে যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যবহার করেছে।

প্রারম্ভিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতাদের ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও তারা এই ভিন দেশের আইন-কানুন, কালচার বা নিয়মানুবর্তিতা সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল ছিলেন বলে মনে হয় না। গত কয়েক মাস ধরে প্রাইভেট ডিটেক্টিভদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আমরা বাংলাদেশ সোসাইটির সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনেছি। অনেক কিছুর বিবরণ ছাড়া আজ আমরা একটি সংক্ষিপ্ত আকারে সোসাইটির দুরাবস্থার কথা তুলে ধরবো। অনেক কিছুর বিবরণ আজ এজন্যই দেব না যেহেতু সোসাইটির বর্তমান কমিটি এবং বোর্ড অফ ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধে আমাদের দুইটি পৃথক মামলা কুইন্স সুপ্রিম কোর্টে  বিচারাধীন রয়েছে। সোসাইটির বর্তমান নির্বাহী কমিটির কার্যকাল শেষ হলেও তারা এখনো প্রতিষ্ঠানটিকে অবৈধভাবে নিয়ন্ত্রণ করে লুটপাটের মাধ্যমে তাদের নিজ স্বার্থ হাসিল করছে; অথচ কমিউনিটি তথা সোসাইটির প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনে হাজারো রকম ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হয়েছে। 

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়: গত চার দশক আগে বাংলাদেশ সোসাইটি প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশ সোসাইটির বর্তমান অবস্থা নিম্নরূপ:

১. সোসাইটির সংবিধান থাকলেও এর কোনো প্রকার প্রয়োগ না থাকায় গত চারদশক যাবৎ যারাই সংগঠিনটিকে পরিচালনা করেছে তারাই ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে সোসাইটিটিকে নিজের সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে। দুর্নীতির মাধ্যমে সংগঠনটির তহবিল তছরুপ থেকে শুরু করে সংগঠনের মধ্যে এমনি এক পরিস্থিতি তৈরী করেছে যে ওখানে কোনো শিক্ষিত, মার্জিত ও সমাজসেবীরা বাংলাদেশ সোসাইটি থেকে হাজার মাইল দূরে থাকে। তাছাড়া বাংলাদেশ সোসাইটির সংবিধানটি আমেরিকার ফেডারেল এবং স্টেট আইনের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই সঙ্গতিপূর্ণ না থাকায় অযোগ্য এবং অসৎ নেতৃত্ব সব ধরণের অপকর্ম করতে সক্ষম হয়েছে। 

২. বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন পদ্ধতি সোসাইটির সংবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বিধায় অশিক্ষিত, অযোগ্য, অনভিজ্ঞ, অদূরদর্শী লোভী, অসৎ ও স্বার্থান্বেষী লোকজন বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাহী কমিটি ও বোর্ড অফ ট্রাস্টি’তে জায়গা করে নিয়েছে। 

৩. নিউইয়র্কে বাংলাদেশ সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পর সোসাইটির নামে বাড়ি ক্রয় ছিল সোসাইটির একমাত্র অর্জন। কিন্তু বাড়ি ক্রয়ের দিন থেকে আজ পর্যন্ত প্রপার্টির ট্যাক্স, মর্টগেজ, মেইনটেনেন্স এবং সিটি ও স্টেট এর বিল্ডিং কোড অনুযায়ী রক্ষণাবেক্ষনের ক্ষেত্রে সোসাইটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা সকল প্রকার দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।

৪. প্রপার্টির ভাড়া দেয়া ও ভাড়া উঠানোতেও রয়েছে যথেষ্ট ঘাপলা। ভাড়া তোলা হয়েছে, কিন্তু রিসিট দেয়া হয়নি। পরবর্তীতে ভাড়া কে উত্তোলন করেছে তাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

৫. বাংলাদেশ সোসাইটিকে ‘নট ফর প্রফিট’ সংস্থা হিসেবে দেখানো হলেও কোন এক না জানা কারণে সোসাইটির সম্পত্তির উপর সিটি এবং স্টেট এর ট্যাক্স ধারণ করা হয়েছে। সোসাইটির তথাকথিত নির্বাহী কমিটি এবং বোর্ড অফ ট্রাস্টি প্রোপার্টিটির ভাড়া উত্তোলন, সদস্য ফি এবং ডোনেশন সংগ্রহের পরেও প্রোপার্টিটির ট্যাক্স এবং মর্টগেজ পেমেন্টের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। সোসাইটির তথাকথিত কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার জন্যই প্রপার্টির ট্যাক্স লীন একাধিকবার বিক্রয় হয়েছে। অথচ সোসাইটির তথাকথিত কর্মকর্তারা প্রপার্টি ট্যাক্স লীন সেল বন্ধ করা তো দূরের কথা, ট্যাক্স লীন সম্পর্কে তাদের কোন ধারণাই  নেই। 

৬. বাংলাদেশ সোসাইটি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যকে আড়াল করে সোসাইটির তথাকথিত কর্মকর্তারা বানোয়াট এক নির্বাচন পদ্ধতির আবিষ্কার করেছে। নির্বাচনের পূর্বে সংবিধানের তোয়াক্কা না করে  ডলারের বিনিময়ে স্বাক্ষর নকল এবং ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে তারা হাজার হাজার সদস্য সংগ্রহ করে যাহা স্টেট ও ফেডারেল আইনের পরিপন্থী। সঠিক নির্বাচন পদ্ধতির অভাবে কিছু লোকজন কোনো প্রকার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই কর্মকর্তা পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এসব লোকজনরা তাদের ট্যাক্স রিটার্ন-এ ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার বাৎসরিক আয় দেখানোর পর সোসাইটির নির্বাচনে তারা কি করে লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে?

৭. সোসাইটির তথাকথিত কর্মকর্তারা বাৎসরিক বনভোজনের নামে এমনকি প্রবাসের কেউ মারা গেলে মৃতের কবরের আয়োজনের নামেও পয়সা চুরির অজুহাত তৈরী করে। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের নামে যেসব ইভেন্ট তৈরী করে তার একমাত্র লক্ষ্য ডলার চুরি করা। 

৮. এসকল অবৈধ কর্মকান্ড বন্ধ করার লক্ষ্যে  আমি নিরু নিরা এবং ওসমান চৌধুরী আদালতের স্মরণাপন্ন হয়েছি। আমরা বিভিন্নভাবে কম্যুনিটির অনেকের কাছ থেকেই সাহায্য চেয়েছিলাম। কিন্তু কেউই এগিয়ে আসেনি। পরিশেষে আমরা উই আর দি পিপল এবং লিগ্যাল নেটওয়ার্কের স্মরণাপন্ন হলে জনাব জেকব মিল্টন বাংলাদেশী কমুনিটির কল্যাণের লক্ষ্যে আমাদেরকে সাহায্য করতে রাজী হন। 

বাংলাদেশী কম্যুনিটির উন্নয়নকল্পে নীরু এস নীরা তাদের এই পদক্ষেপে প্রবাসী বাংলাদেশীদের সহযোগিতা কামনা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে সোসাইটির উল্লেখিত মামলা, ট্যাক্স লীন, ট্যাক্স লীন সেল, প্রপার্টি ভায়োলেশন, সোসাইটির অসঙ্গতিপূর্ণ সংবিধান ও নির্বাচন পদ্ধতি এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে উপস্থিত সাবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব ও ব্যাখ্যা দেন জেকব মিল্টন। তিনি বলেন, আমরা সোসাইটির খবরাখবর নিয়েই আইনের আশ্রয় নিয়েছি।

এদিকে বাংলাদেশ সোসাইটির নানা অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমীন সিদ্দিকীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের সময়ে কোন অনিয়ম হয়নি। তবে সোসাইটির লীন সহ অন্যান্য বিষয়ে আইনী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ