চলনবিলে নৌকাডুবি: এক যাত্রীর কনফেশান (স্বীকারোক্তি)

October 7, 2018, 1:00 PM, Hits: 105

চলনবিলে নৌকাডুবি: এক যাত্রীর কনফেশান (স্বীকারোক্তি)

শাফি বাশার খান, হ-বাংলা নিউজ :  গত  ৩১শে আগস্ট শুক্রবার চলনবিলে নৌকাডুবিতে পাঁচ জনের অকাল মৃত্যু ঘটে। এই মৃত্যু হৃদয়বিদারক। এই পত্রের লেখক অসুস্থ হয়ে পড়ায় এ নিয়ে অনুষ্ঠিত শোকসভা এমন কি উদ্ধারকার্য কোনো কিছুতেই অংশ নিতে পারেন নি বলে অত্যন্ত দুঃখিত। নৌকার যাত্রী হিসাবে লেখকের দায়বোধ থেকে এই লেখা। তবে স্মৃতি থেকে লেখায় ভুল থাকা অসম্ভব নয়। বেশ কিছুদিন থেকে আমাদের সা¤প্রতিকতম বন্ধু সাইদুরের সঙ্গে কথা হচ্ছিল যে আমরা চলনবিল দেখতে যাব যেখানে ছোটবড় অনেক নদী বিভিন্ন দিক থেকে এসে মিলিত হয়েছে--যা ভরাবর্ষায় বিপুল জলরাশির আকার ধারণ করে। আমি কখন যেতে পারবো, অনেকটা তার উপর এই যাত্রা নির্ভর করছিল। এরপর হঠাৎ একদিন সাইদুরের সঙ্গে আলাপে স্থির হল গত শুক্রবার ৩১ আগস্টেই তা হতে পারে, উনি আমাকে এ বিষয়ে ঈশ্বরদীতে মোশাররফ হোসেন মুসা (লেখক) ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করতে বললেন। এদিকে কুষ্টিয়া থেকে সাত-আট জন আর ঈশ্বরদী থেকে সমসংখ্যক যাবেন বলে স্থির হলেও যাত্রার আগের দিন জানা গেল ওখান থেকে চৌদ্দ-পনেরো জন আসবেন। এখন বলে রাখা ভালো, কেন জানি না, আমি বিদেশ ফেরত বলে এই নৌ-যাত্রার আমি একটি উপলক্ষও বটে। 

যাত্রার আগে আমার ছোটভাই আজম বলল, আমাদের লাইফ-জ্যাকেট কিনে সঙ্গে রাখা উচিত। আমার স্ত্রী এ বিষয়ে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা সত্তে¡ও সময়াভাবে তা আর করা হল না। আমরা সবাই ভাঙ্গুড়া-বড়াল ব্রিজে গিয়ে পৌঁছানোর পর সাইদুর এবং অন্যান্যরা একটি অথবা দুটি নৌকা ভাড়া করতে গেলেন, আর আমরা সবাই নদীর ধারে তীব্র খরতাপ থেকে বাঁচবার জন্য ছায়া খুঁজে বেড়াচ্ছি। প্রায় আধা ঘণ্টা পরে আমাদেরকে নৌকার দিকে পথ দেখিয়ে নেয়া হল, নৌকাটি দেখে আমি প্রসন্ন বোধ করতে না পারলেও নিশ্চুপ থাকলাম। কিন্তু আজম সাইদুরকে দেখামাত্র দ্বিধাহীনভাবে তার ক্ষোভ ঝাড়লো। ও রাগত স্বরে বলল, এ কেমন নৌকা নিয়েছেন, তা বলে ও সরাসরি সাইদুরকে চার্জ করলো। এমতাবস্থায় আমি ওর পক্ষ অবলম্বন করলাম না। এড়িয়ে গেলাম। আর তাই এহেন ভঙ্গুর, প্রয়োজনের তুলনায় ছোট, অত্যন্ত নাজুক এক নৌকায় আমাদের যাত্রা শুরু হল। শুনেছি যাত্রীদের আরো কেউ কেউ এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করলেও কেউ জোরালভাবে এর বিরুদ্ধাচারণ করেননি।

আমাদের যাত্রার আরো ত্রুটি ধরা পড়ে যখন দেখা যায়, যে কোন পথ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে হবে সে বিষয়ে নৌকার মাঝির কোনো স্পষ্ট ধারনা নেই। তাই পথ প্রদর্শক ছিলেন মুখ্যত সাইদুর, আর চলতি পথের কোনো মাঝি, অন্য নৌকার যাত্রী, অথবা বিলের ধারে কর্মরত কৃষক। তদুপরি নৌকার ছইয়ের ভেতর বসবার স্থান কম হওয়ায় একটু স্বস্থ হয়ে বসার উপায় ছিল না। এজন্য অনেকেই আমরা ছইয়ের ওপর উঠলাম, পা রাখবার মত শক্ত জায়গা কম, দশ-পনেরোজন আরামে বসবার মত পরিসরহীন। আমার পায়ের নিচে ছই চড়বড় করছিল, মনে হচ্ছিল তা ভেঙে পড়তে পারে। 

নৌকার ছইয়ের সামনের দিকে বসে পরিচয় করেছিলাম স্বপন বিশ্বাসের সঙ্গে যার সমস্ত অবয়ব জুড়ে ছিল অফুরন্ত প্রাণশক্তির ছাপ। সদা হাস্যজ্জ্বল, বয়সে তরুণই বলা উচিত, ত্রিশ-বত্রিশের বেশি হবে না হয়তো। আর তার পাশে তার কিশোরী কন্যা সৌদামিনী (সওদা মনি)। শ্যামলা রঙের মেয়েটির কি হাসি আর আনন্দ! আমার স্ত্রীর পাশে বসে চিরপরিচিতের ন্যায় গল্প করছিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তার জীবন প্রদীপ নিভে যাবে কে জানতো! জগতকে দেখার আর জানার কতটা সময়ই না তার ছিল। আমার পাশেই বসে ছিলেন বিল­াল গনি যিনিও চলে গেছেন অচেনা দেশে। একসময় আমরা তাড়াশে পৌঁছালাম, ওখানে এক হোটেলে দুপুরের খাবার খেতে বসেছি। আমার ডানে পাশের টেবিলে বসেছিলেন মুসা ভাইয়ের স্ত্রী আর কন্যা। আমি তাঁর মেয়েকে নাম জিজ্ঞাসা করলাম, জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কোন ক্লাসে পড়। মুসা ভাইয়ের স্ত্রীর মুখমণ্ডলে একধরণের সিগ্ধ সারল্যের ছাপ, আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। এই মানুষটির জীবন দীপ ঘণ্টা খানেক বাদেই নিভে যাবে চিরতরে।

তাড়াশ থেকে ফেরার সময় পুরোটা পথ একইভাবে নৌকায় না ফিরে পাশের রাস্তায় নেমে অন্য কোনো যানবাহনে ফিরে যাবো বলে কথা হয়েছিল। এ সময়ে আমাদের নৌকাটি যখন যমুনা সেতু থেকে বনপাড়া নামক বিশ্বরোডে একটি সেতুর নিকটবর্তী হচ্ছিল তখন আমাদের প্রত্যাশা ছিল আমরা ওই পথে নেমে যাব। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল, নৌকায় ভাঙ্গুড়া যেতে হলে দুই-তিন ঘণ্টার পথ। আর তা ছিল যথেষ্ট বিপদসংকুল। কারণ আর আধ ঘণ্টা বাদেই সন্ধ্যা নেমে আসবে। যাত্রাপথ অপরিচিত। মাঝে মাঝে খুঁটি থেকে বিদ্যুতের তার প্রায় পানি স্পর্শ করেছে। ভাঙ্গুড়ায় একটি সাইনবোর্ডে এ বিষয়ে সতর্ক বার্তা ছিল যে এই সব বিদ্যুতের তারে বা খুঁটিতে আঘাত লেগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। 

এই ফিরতি যাত্রায় নৌকার ছইয়ের পেছন দিকে শক্ত-মত জায়গায় বসতে পেরেছিলাম। আমার স্ত্রী স্নেহ বসেছে নৌকার সম্মুখভাগের উন্মুক্ত অংশে। এই ফিরতি যাত্রার সময় আমার মাথায় একটা চিন্তা এসেছিল যে আমরা পুরুষ যাত্রীরা এবার নৌকার ছইয়ের নিচে আর মহিলা-যাত্রীরা ছইয়ের ওপরে বসুক, যেহেতু আগমনের সময় তাঁরা নিচে বসেছিলেন। তা করতে চাইলে স্থান সংকুলান হতো না, আর তাই তা বলা হয়ে ওঠে নি। 

ছইয়ের ওপরে বসে আমার নিকটে উপবিষ্ট মুসা ভাইয়ের মাধ্যমে আমি একাধিকবার সাইদুরের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করছিলাম যে আমরা সামনের এই রাস্তায় নেমে যাচ্ছি কি না। কিন্তু এই বিষয়ে মুসা ভাইয়ের মনোভাব স্পষ্ট হচ্ছিল না কারণ উনি হয়তো নৌকার এঞ্জিনের শব্দে কিছু শুনতে পারছিলেন না। আর সাইদুর বলছেন, যে আমরা পুরো পথ একই ভাবে নৌকাতেই ভাঙ্গুড়াতে যাই। এখন গরম পড়ে যাওয়ায় সবাই চলনবিল আরো উপভোগ করতে পারবো। নিরাপত্তা-শঙ্কা সত্তে¡ও আমি গররাজি হলেও নিশ্চুপ বসে থাকলাম। সাইদুর তার অতি-উৎসাহ, দেখবার আর দেখাবার রোমাঞ্চ আমাদের সবাইকে ভাগ করে দিতে চাচ্ছিলেন। যদিও সূর্যাস্তের আর বড় জোর আধ ঘণ্টা বাকি। 

এরপর হঠাৎ ঠাশ্ করে একটি বিকট শব্দ হবার সঙ্গে সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে যখন নৌকাটি ডুবে গেল, তখন আমি এক লাফে নৌকার সম্মূখভাগে চলে গেলাম যেখানে আমার স্ত্রী বসেছিল। ওর এমন সন্ত্রস্ত মুখমণ্ডল কখনো দেখিনি। আমাকে জাপটে ধরল, বললাম, অস্থির না-হয়ে ধীর স্থির ভাবে  আমাকে ধরে ভেসে থাকবার চেষ্টা করো। ছোট একটি বাঁশের কাবারির মত কিছু একটা দেখলাম, ওকে ওটা ধরতে বললাম, দেখলাম ওটা তেমন কিছু না। আমার পরনে মোটা কাপড়ের প্যান্ট, হালকা হবার জন্য আমার আন্ডার প্যান্ট রেখে ভারি প্যান্ট খুলে ফেলে দেবার প্রয়োজন বুঝলেও তা করবার মত শক্তি ছিল না, মনে হচ্ছিল তা করতে গেলেই ডুবে যাব, কারণ শরীরে কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। হাতের ফোন ফেলে দিলাম। একবার মনে হল আমরা নিশ্চিত ডুবতে বসেছি। তখন মনে হল, ওর যদি ডুবে যেতে হয় তাহলে আমার সিদ্ধান্ত যে আমাকেও ওর সঙ্গে ডুবতে হবে, কারণ প্রথমত ও আসতেই চায়নি। আমিই তাকে জোর করে এনেছি। কিন্তু দেখা গেল আমার থেকে ভেসে থাকবার শক্তি ওর কিছুটা বেশি ছিল। 

সবার আর্তচিৎকারে অদূরে বাড়ির এক গৃহবধূ নৌকা ভাসালেন। তার নৌকা আমাদের কাছে এলে তিনি আমার স্ত্রীর দিকে তার লগি এগিয়ে দিলেন। আমার স্ত্রী তা ধরে থাকলে হাবিবের সহায়তায় নৌকায় উঠে গেলেন। আর আমি নৌকার গলুই ধরে ভেসে থাকলাম। আমাকে আমার স্ত্রী এবং অন্যরা নৌকায় ওঠাতে চাইলেন। আমি বললাম, আমি ঠিক আছি--এখন নিরাপদ, আপনারা অন্যদের দেখুন। তবে আরো কতক্ষণ ভেসে থাকতে পারতাম জানি না। কারণ আমার ঝুলে থাকার শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছিল। নৌকা ডোবার পর হয়তো তিন-চার  মিনিট ভেসে ছিলাম। শাহনাজ পারভীন নামের গৃহবধূ তার নৌকা নিয়ে না এলে মনে হয় আর পনেরো থেকে বিশ সেকেন্ডের বেশি ভেসে থাকতে পারতাম না। এই সময়ে কুলে ওঠা গনি ভাইয়ের মেয়ের আর্তনাদ কানে এলো, এখানে তো সকলেই আছে, আমার আব্বু আর আমার আম্মু কোথায়! সে হচ্ছে দর্শনের ছাত্রী বিল­াল গনি ভাইয়ের কন্যা। এই প্রশ্নের তো কোনো উত্তর ছিল না। আমি নৌকা কুলে না-ভেড়া পর্যন্ত ওভাবে নৌকার গলুইয়ে ঝুলে থাকলাম। কিন্তু কিনারায় গিয়ে ডাঙায় ওঠার শক্তি পেলাম না। তখন হাবিব আমাকে টেনে তুললো। ইতিমধ্যে হাবিব আমার রক্তচাপ দেখলো, স্যালাইন দিলে আমি বমি করে ফেললাম। প্রায় পনেরো-বিশ মিনিট আমি উঠে দাঁড়াবার শক্তি পেলাম না।  এর মধ্যে আমার ছোটভাই আজম কান্না জড়িত কণ্ঠে আমার দিকে এগিয়ে এলো, ও ভেবেছিল হয়তো আমি ডুবে গেছি। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই নৌকাডুবির পুরো সময়ে ওর কথা ভুলেছিলাম, ওর কথা আমার মনেও আসেনি। ও ডুবে গেলে আমি দায়ী থাকতাম। কারণ ও এসেছে শুধু আমার জন্য।

যে কোনো ভ্রমণ বিশেষ করে নৌ-যাত্রায় ঝুঁকি থাকবে। কিন্তু এমন একটি নৌকায়, ঘোর অন্ধকারে যেখানে নৌকার নিজস্ব কোনো আলো নেই সেখানে আমরা কেন এমন ঝুঁকি নেব? প্রথমত আমি আমার নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে চাইবো না কারণ তা দায়িত্বশীলতার পরিচায়ক হবে না। আর যদি তা করি, তবে তা অন্য দশজনের ক্ষেত্রে করতে পারি কি? এখানে আমরা সবাই কি নির্বোধ হয়ে গিয়েছিলাম? আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ভ্রমণের সকল ব্যবস্থাপনা বন্ধুদের অভিজ্ঞতা আর বিবেচনার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম যা মোটেই যথার্থ হয়নি। বহুদিন বিদেশ বাসের কারণে আমাকে স্বদেশেও বিদেশীর মত ভাবছিলাম; যা মারাত্বক ভুল ছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা গেল যে, সাঁতার জানা ভেসে থাকবার জন্য আবশ্যক হলেও যথেষ্ট নয় (ঘবপবংংধৎু নঁঃ হড়ঃ ংঁভভরপরবহঃ), কারণ যাঁরা ডুবেছেন, তাঁরা সবাই সাঁতার জানতেন। আর দ্বিতীয়ত পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রস্তুতি বা সেফটি প্রিপারেশন (যার অন্তর্ভুক্ত নৌকার ফিটনেস, যাত্রীদের লাইফ-ভেস্ট ইত্যাদি) ছাড়া কখনো এ প্রকার নৌযাত্রা অনুচিত। আর এই বোধটুকু ধারণ করতে রকেট বিজ্ঞানী হবার দরকার পড়ে না। আর তাড়াশে যাত্রা বিরতির সময় দুজন যাত্রী নৌকা থেকে নেমে ফিরতি পথে আর নৌকায় ওঠেননি। কারো কারো থেকে তাদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য কানে এসেছিল। এ বিষয়ে তাদের সমালোচনা করবার আগে, আমাদের অনুসন্ধান করে দেখা উচিত যে, তাঁরা কেন আমাদের সংগ ত্যাগ করলেন। হয়তো  তাঁরা নিরাপদ বোধ করেন নি। তবে তারা যদি গোপনে না গিয়ে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে যেতেন তাহলে আমরাও হয়ত তাদের সঙ্গে সড়ক পথে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করতাম।  

 
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ