এক মাওলানা সাদকে নিয়ে কেন তাবলীগ বিশ্ব দ্বিধা-বিভক্ত

January 10, 2018, 9:53 PM, Hits: 690

এক মাওলানা সাদকে নিয়ে কেন তাবলীগ বিশ্ব দ্বিধা-বিভক্ত

হ-বাংলা নিউজ : গত নভেম্বর মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্দালভির পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে সুরাহা বৈঠক হাতাহাতিতে পরিণত হয়েছিল। এখন তা আরো প্রকাশ্যে হয়ে রাজপথে বিক্ষোভে রুপ নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে তাবলীগ জামাতের নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্যে তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যাতে এ বিতর্ক এড়ানো যায় সেজন্যে সরকারের তরফ থেকে ইসলামী চিন্তাবিদদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন পর্যন্ত করে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্দলভির কোরাআনের মনগড়া ব্যাখ্যা বন্ধ না হওয়ায় এবং প্রখ্যাত তাফসীকারকদের ব্যাখ্যাকে ভুল বলা অব্যাহত রাখায় তাকে নিয়ে বিতর্ক আরো বেড়েছে। যে সব তরুণ তাবলীগের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দ্বীন শিক্ষার সুযোগ নিতেন তাদেরও সমালোচনা করে মাওলানা সাদ আপত্তিকর বক্তব্য রেখেছেন। তার এমন একটি বক্তব্য হচ্ছে যারা বা যেসব আলেম ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তারা আলেমে ছ’ অর্থাৎ নিকৃষ্ট ধরনের আলেম। স্বভাবতই তার এধরনের বক্তব্য কোনো উৎকৃষ্ট উদাহরণ সৃষ্টি করেনি বরং ক্ষোভ বৃদ্ধি করেছে মুসল্লিদের মধ্যে।

ঢাকায় এসে মাওলানা সাদ পুলিশি প্রহরায় কাকরাইল মসজিদে আশ্রয় নিলেও এখন পর্যন্ত তিনি ইজতেমায় অংশ নেবেন কি না বা নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি না তা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মাওলানা সাদ’কে ইজতেমায় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে নিজেদেরই সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়েছে। তবে অধিকাংশ মুসল্লী মনে করেন তাকে নিয়ে যখন বিক্ষোভ রাজপথে গড়িয়েছে কিংবা ধর্মীয় নেতার শ্রদ্ধার আসনটি অবশিষ্ট নেই বা বিতর্কিত হয়েছে তাই ইজতেমার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই মাওলানা সাদের উচিত হবে ফের কোনো অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি না করে ইজতেমায় অংশ না নিয়ে এই মহান আয়োজনটি সুসম্পন্ন হতে দেওয়া। কারণ তিনি ইজতেমায় অংশ নিলে কমবেশি বিতর্ক বা বিক্ষোভ আরো প্রকাশ্য হয়ে পড়বে।

মুসল্লীদের অনেকে মনে করছেন, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ এবং এরফলে সৃষ্ট তীব্র যানজটের কারণে তাবলীগ জামাতের ভাবমূর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। এসব জেনেও মাওলানা সাদ কেন বাংলাদেশে ইজতেমায় এসেছেন তার পেছনেও এ বিশাল আয়োজনকে বিতর্ক বা আরো বিভক্তি সৃষ্টি করার মিশন নিয়েই কোনো মহল তাকে পাঠিয়েছে কি না এমন সন্দেহ করছেন অনেকে। এসব বিষয় বিবেচনা রেখেই সরকারের তরফ থেকে গত বছর তাবলীগ জামাতের দুই অংশের নেতৃবৃন্দ এবং ইসলামী চিন্তাবিদদের নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় কয়েক দফা আলোচনা করে। বিরোধ মেটানোর জন্য ইসলামী চিন্তাবিদদের নিয়ে সরকারের গঠিত একটি উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য হচ্ছেন মাওলানা মাহমুদ হাসান। তিনি জানিয়েছেন, এখনো বিরোধ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে তারা চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

অথচ উপমহাদেশের সুন্নি মুসলমানদের বৃহত্তম সংগঠন তাবলীগ জামাতের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কারো কাছেই কাম্য নয়। কিন্তু নেতৃত্বের কোন্দলে গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে তাবলীগের কেন্দ্র্রস্থল কাকরাইলে দুই দল কর্মীর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। কার্যত মাওলানা সাদকে নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া এমনকি ইউরোপ আমেরিকায় পর্যন্ত তাবলীগ জামাতের অনুসারীরা দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। তবে অধিকাংশ অনুসারীরা মাওলানা সাদের আপত্তিকর ও উস্কানিমূলক বক্তব্যে আহত হয়েছেন। এখন মাওলানা সাদ শুক্রবার বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নেবেন কী নেবেন না সেটি নিয়ে তাবলীগ জামাতের দুই অংশ মতৈক্যে পৌঁছাতে পারছেন না। তবে তা পারলে বিতর্কের অবসান হত। এছাড়া কোনো সময় তাবলীগ জামাত নিয়ে এধরনের বিতর্ক ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেনি।

দুটি অংশের নেতারাই বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিচ্ছেন। টঙ্গিতে তুরাগ নদীর পাড়ে ইজতেমার সব আয়োজন শেষ পর্যায়ে। তাবলীগ জামাতের একটি অংশ বলছে ভারত থেকে আসা মাওলানা সাদ এবার ইজতেমায় অংশ নেবেন না। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। অন্য অংশ চাইছে মাওলানা সাদ ইজতেমায় অংশগ্রহণ করুক। অন্তত কাকরাইল থেকে মাওলানা সাদকে তার বক্তব্য কিংবা তাকে নিয়ে বিতর্কের ব্যাপারে তার বক্তব্য শোনার সুযোগ করে দেওয়া হোক।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তাবলীগ জামাতের দুই অংশের নেতাদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান হবে বলে সরকার মনে করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় তাবলীগ জামাতের মূল কেন্দ্র হচ্ছে দিল্লিতে। সেখানকার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মাওলানা সাদকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন অনেক আগে। এর প্রভাব পড়েছে পাকিস্তান, মধ্য এশিয়ার দেশ ছাড়াও মালয়েশিয়াসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোতে। গত দুই বছর ধরে এ বিভক্তি এখনো নিরসন হয়নি। ব্রিটেন, আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে তাবলীগ জামাতের নেতৃত্বের বিভক্তি দেখা দিয়েছে অনেকদিন আগে। সংগঠনের ভেতর থেকেও বিভিন্ন দেশে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা থাকলেও তাতে এখনো ইতিবাচক ফলাফল দেখা যাচ্ছে না।

 

 
সর্বাধিক পঠিত
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ